Dark Mode
Saturday, 28 January 2023
Logo

বিদায়ী বছরে দেশের বীমা খাতের হালচাল

বিদায়ী বছরে দেশের বীমা খাতের হালচাল

করোনা মহামারি থেকে শুরু করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ডলার সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যদিয়ে আরও একটি বছর পার করলো দেশের বীমা খাত। বিদায়ী বছরে জীবন ও সাধারণ বীমা খাতে বেশ কয়েকটি ইস্যু সাড়া ফেলে দেশজুড়ে। ঘটে যাওয়া এসব আলোচিত-সমালোচিত ঘটনার রেশ বীমা খাতকে নতুন বছরেও টানতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

 

বীমা খাতে ২০২২ সালের মতো কেলেঙ্কারির ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান জড়িয়েছেন নানা বিতর্কে। শেষপর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করতে হয়েছে তাকে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে ২০১০ সালে বীমা খাতকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়। বীমা অধিদপ্তর বিলুপ্ত করে প্রতিষ্ঠা করা হয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সেইসঙ্গে করা হয় নতুন বীমা আইন। আইডিআরএ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর প্রথমদিকে সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তারা দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেন।

 

অনিয়মের মধ্যে থাকা প্রায় নিয়মের মধ্যে চলে আসে বীমা কোম্পানিগুলো। কিন্তু আগের ধারায় চলে যায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ২০২০ সালে ড. এম মোশাররফ হোসেন আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান হওয়ার পর ক্ষমতার অপব্যবহার করে অযোগ্য ব্যক্তিকে বীমা কোম্পানির সিইও করা, কোম্পানির কাছে ঘুষ দাবি করাসহ নানা অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানের বিরুদ্ধে এ ধরনের দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ আগে কখনো ওঠেনি।

 

ওদিকে হঠাৎ করেই মোশাররফের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি করার অভিযোগ তোলে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এ অভিযোগ তোলার কয়েকদিনের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক বসান মোশাররফ হোসেন। এরপর আদালতে ডেল্টা লাইফ নিয়ে একাধিক মামলা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে আইডিআরএ থেকে পদত্যাগ করেন মোশাররফ। আইডিআরএ’র চেয়ারম্যানের পদ থেকে মোশাররফের পদত্যাগের পাশাপাশি ২০২২ সালে বীমা খাতে সব থেকে আলোচিত বিষয় ছিল ফারইস্ট ইসলামী লাইফের প্রতিষ্ঠাতা এম এ খালেক এবং সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের জেলে যাওয়া। ফারইস্ট লাইফে লুটপাট চালিয়ে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে চলতি বছর গ্রেপ্তার হন খালেক ও নজরুল। বর্তমানে এ দুজন কারাগারে।

 

২০২২ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লন্ডন প্রবাসী ৭ পরিচালককে কোম্পানির প্রধান কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার করে মতিঝিল থানা। মাগুরার কথিত ৪ গ্রাহকের সাজানো মামলায় এ ৭ পরিচালককে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ২৬শে সেপ্টেম্বর তাদের জামিন আবেদন করা হলেও তা নাকচ করেন আদালত। এরপর ২৯শে সেপ্টেম্বর জামিন লাভ করেন।

 

এ বছর বীমা খাতে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল একটি গ্রুপের ডেল্টা লাইফ দখলের চেষ্টাও। এতে সহায়তা করার চেষ্টা করেন দুর্নীতির অভিযোগে আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করা মোশাররফ।

 

কিন্তু মোশাররফ পতদ্যাগ করলে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে ডেল্টা লাইফ থেকে প্রশাসক তুলে নেয় আইডিআরএ। এতে ফের ডেল্টা লাইফের কর্তৃত্ব ফিরে পেয়েছেন কোম্পানিটির সাবেক পরিচালকরা।

 

২০২২ সালে বীমা খাতে বিভিন্ন কেলেঙ্কারির মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করে ডেল্টা লাইফের মাস্ক কেলেঙ্কারি। মাস্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় কোম্পানিটির সাবেক প্রশাসক ও আইডিআরএ’র সাবেক সদস্য সুলতান উল-আবেদীন মোল্লাকে কারাগারেও যেতে হয়।

 

বীমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের দাবির টাকা ঠিকমতো পরিশোধ করে না। উল্টো বিভিন্নভাবে গ্রাহকদের হয়রানি করে- এ অভিযোগ পুরোনো হলেও এখনো এ অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। আগের মতোই এখনো বিভিন্ন বীমা কোম্পানি গ্রাহকদের দাবির টাকা পরিশোধে নানা টালবাহানা করছে। প্রতিটি বীমা কোম্পানিতেই গ্রাহকদের বীমা দাবির টাকা বকেয়া রয়েছে।

 

গ্রাহকদের বীমা দাবির টাকা না দেয়ার তালিকায় ২০২২ সালে যেসব জীবন বীমা কোম্পানি সব থেকে বেশি আলোচিত এর মধ্যে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বায়রা লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ। এ কোম্পানিগুলোতে বিপুল গ্রাহকের বীমা দাবির টাকা বকেয়া রয়েছে।

 

আইডিআরএ সূত্রমতে, আস্থা কমায় বীমা কোম্পানিতে গ্রাহকের সংখ্যাও কমেছে। বছর পাঁচেক আগে যেখানে দেশে ব্যবসা করা জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর চলমান বীমা পলিসির সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৮ লাখ ৬০ হাজার। ২০২২ সালে তা কমে ৭৩ লাখ ৮৩ হাজারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর পলিসি সংখ্যা কমে অর্ধেকে চলে এসেছে। অথচ এ সময়ের মধ্যে একদিকে দেশে ব্যবসা করা জীবন বীমা কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে বড় হয়েছে দেশের অর্থনীতি। বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি এবং দেশি-বিদেশি মালিকানায় ৩৫টি জীবন বীমা কোম্পানি ব্যবসা করছে। পাঁচ বছর আগে এ সংখ্যা ছিল ৩১টি। জীবন বীমা কোম্পানিগুলোতে গ্রাহক সংখ্যা গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কমেছে।

 

 মানবজমিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে দেশে ব্যবসা করা জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর সচল পলিসি ছিল ৯৭ লাখ ৪০ হাজার। পরের বছর ২০২০ সালে তা কমে ৮৫ লাখ ৬০ হাজারে নেমে আসে। ২০২১ সালে আরও কমে ৮২ লাখ ৮০ হাজারে দাঁড়ায়।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬০ সালের ১লা মার্চ তৎকালীন আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে যোগদান করেছিলেন। তার এ যোগদানের দিনটিকে জাতীয় পর্যায়ে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ১লা মার্চকে জাতীয় বীমা দিবস ঘোষণা করে সরকার। ২০২২ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সভায় জাতীয় বীমা দিবসকে ‘খ’ শ্রেণি থেকে ‘ক’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।

 

চলতি বছরের ২৪ ও ২৫ নভেম্বর বরিশালের বঙ্গবন্ধু উদ্যানে (বেল্‌স পার্ক) অনুষ্ঠিত হয় দুদিনব্যাপী বিভাগীয় বীমা মেলা-২০২২।

 

‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বঙ্গবন্ধু সুরক্ষা বীমা’ নামে নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধীদের জন্য নতুন বীমা পরিকল্প চালু করেছে সরকার। চলতি বছরের ১লা মার্চ জাতীয় বীমা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন এই বীমা পরিকল্পের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

 

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের ৫৬টি কোম্পানির মধ্যে ১২টি জীবন বীমা হলেও ৪২টি সাধারণ বীমা কোম্পানি। এই ৪২টি কোম্পানির মধ্যে চলতি বছরের তিন প্রান্তিকে বা ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২২) আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ৪২টি কোম্পানি। এরমধ্যে ২৩টি কোম্পানির মুনাফা বেড়েছে। আর মুনাফা কমেছে ১৯টি কোম্পানির। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

 

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, বীমা খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি গ্রাকদের আস্থা বাড়াতে মনযোগ দিতে হবে। তাহলেই এ খাত ঘুরে দাঁড়াবে আশা করা যায়।

 

বিটি/ আরকে

 

 

Comment / Reply From

Stay Connected

Vote / Poll

ঈদযাত্রায় এবছর যানজট অনেকটা কম হবার কারণ কী বলে মনে করেন?

View Results
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ পদক্ষেপ
0%
যথাসময়ে সড়কের উন্নয়ন কাজ শেষ
100%
যানজট এখনও রয়েই গেছে
0%
21313